নীড়াকে আমি খুন করতে চাইনি৷ তবে নীড়ার কাছ থেকে আমার অনেক তথ্য জানার ছিলো।
হঠাৎ গলায় মারাত্মক শক অনুভব করি। আস্তে আস্তে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
জ্ঞান হারানোর পথে আমার বার বার মনে পড়ছিলো,আমার আর কখনোই
নীড়ার ফর্সা গালদুটোতে ব্লেডের কোনা টেনে ছবি আঁকা হলোনা।
যখন চোখ মেলে তাকালাম চারদিকে অদ্ভুত আবছা অন্ধকার বাদে আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হলোনা।
একটা ঢালা বিছানায় আমাকে ফেলে রাখা হয়েছে।
আবছা অন্ধকারেই দেখতে পেলাম রুমে একটা ১০০ ওয়াটের হলুদ বালব সিলিং থেকে লম্বা হয়ে বেয়ে আসা তারের মাথায় ঝুলে আছে। এক কোনায় পরে আছে একটা চেয়ারের ভাংগা কংকাল। চেয়ারে বসার জায়গায় থাকা ফোম গুলো ছেড়াফাড়া অবস্থায় রুমের অন্য এক কোনে পড়ে আছে।
দেয়ালে অনেক হিজিবিজি লেখালেখি। পুরো রুম জুড়ে ভেজা মাটির একটা সোঁদা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। মাথার নিচে দু হাত দিয়ে উপরের সিলিং এর দিকে তাকিয়ে শুয়ে রইলাম। বুঝছি না এখন আমার কি করা উচিৎ কিংবা কি করতে হবে।
অন্ধকারে নিমজ্জিত আছি। সময় কাটানোর জন্য অন্ধকার নিয়েই ভাবতে শুরু করলাম।
অন্ধকার জিনিসটা ভালো নাকি খারাপ?
যদি অন্ধকার খারাপ হয় তাহলে ভালো কে? আলো?
অন্ধকারের রঙ কালো।
আলোর রঙ কি?
নাকি আলোর নিজস্ব কোন রঙ নেই?
যার মাঝে নিজস্বতা নেই সে বেশি উত্তম নাকি যার নিজস্বতা আছে সে বেশি উত্তম?
সময় কাটিয়ে দেয়ার জন্য এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ভেবে চিনতে বের করাটাই এনাফ।
আঁটসাট বেঁধে প্রথম প্রশ্নের উত্তর ভাবতে শুরু করবো, এমন সময়ে
বাইরে থেকে খটখট আওয়াজ শুনতে পেলাম। বুঝতে পারলাম কে বা কারা যেন চাবি ঘুরিয়ে দরজার লক খুলছে।
একজন লোক দরজা খুলে রুমে প্রবেশ করেই সুইচ টিপে লাইট জ্বালিয়ে দিলো। আমার রুমে বিচ্ছিন্ন ভাবে ছড়িয়ে রাখা অন্ধকার ও আমার অগোছালো চিন্তাভাবনার জালগুলো হুট করেই কেমন উধাও হয়ে গেল। আলো জ্বালানোর পরে বুঝতে পারলাম রুমে আমি একা ছিলাম না এতক্ষন।
ফ্লোরে দু চারটা নেংটি ইঁদুর ও ঘোরাঘুরি করছিলো। অন্ধকারের ভেতর ওগুলো আমার দৃষ্টির আড়ালে ছিল। হুট করে লাইট জ্বলে ওঠায় ওরা দৌড়ে একটা গর্তের ভেতর ঢুকে গেল। গর্তের ছোট্ট মুখটা এখান থেকে অন্ধকার দেখাচ্ছে। মাটির উপরে ইট বিছিয়ে মেঝে তৈরি করা,
সেটাও এইমাত্র খেয়াল করলাম। দুজন কালো মুখোশ পরিহিত লোক এসে আমার জন্য এক বোতল পানি এবং একটা পাউরুটি দিয়ে চলে গেল।
স্বাভাবিক ভাবেই ওরা আবারো আসবে। আর এর ভেতর এখান থেকে পালানোর উপায় খুঁজে বের করতে হবে।
ইঁদুর দুটি অন্ধকারের রহস্যময়তা দিয়ে আমাকে এখান থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজে দিয়েছে।
চেয়ার থেকে একটা কাঠের টুকরো খুলে নিয়ে সেটা দিয়ে ইট সরিয়ে দরজা থেকে ডান দিকের কোনায় দেয়াল ঘেষে গর্ত খুড়তে শুরু করলাম। মাটি ভেজা ভেজা থাকায় বেশ অল্প পরিশ্রমেই দু তিন ফুট গভীর গর্ত খোড়া সম্ভব হয়।
ওদের দেয়া পাউরুটি টুকরো টুকরো করে গর্তের ভেতরে ফেলি। এরপর চেয়ারের পরিত্যক্ত ফোম এবং বাকি কাঠের টুকরোগুলো গর্তের ভেতরে ফেলি।
এবার আমার অপেক্ষার পালা।
অপেক্ষার প্রহরগুলো সবসময় দীর্ঘ হয়। ওদের আসার আগ পর্যন্ত আমি আবার আমার আলো - আধারের চিন্তাভাবনা গুলো নিয়ে বসলাম।
ওদের পায়ের শব্দ যখন শুনতে পেলাম ততক্ষনে আমার মনে জাগা প্রশ্নগুলোর উত্তর যথাযথভাবে বের করে ফেলেছি।
যাই হোক ওরা দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করার আগেই আমি দরজার পাশে এমন ভাবে গিয়ে দাঁড়াই যাতে দরজা ধাক্কা দিয়ে খুললে আমি কপাট এর আড়ালে ঢাকা পরি।
ওরা দরজা খুলেই লাইটের সুইচ টিপে। কিন্তু লাইট আমি আগেই ভেংগে ফেলেছিলাম। লাইটের আলো না জ্বলায় ওরা দ্রুত গতিতে মোবাইলের টর্চ ফেলে। রুমের এক কোনায় গাড় অন্ধকারযুক্ত বড় একটি গর্তের মুখ দেখে দুজনেই ছুটে যায় সেদিকে। আমি এ সময়ে সুযোগ বুঝে দরজার আড়াল থেকে বের হয়ে ঝেড়ে দৌড় দিলাম। ওরা চেয়ারের টুকরো, ফোম সরানোর পরে নেংটি ইঁদুর দুটো লাফালাফি করে বের হবে। এরপর বুঝতে পারবে গর্তটা আসলে ওদের বোকা বানানোর জন্য বানিয়েছিলাম। ততক্ষনে আমি এদিক থেকে পগার পার হয়ে যাব।
আমার প্লান অনুযায়ী কাজ ও হয়। দূর থেকে আসা কিঞ্চিৎ আলোর সোজা দৌড়াতেই আমি একটা সিঁড়ি পেয়ে যাই। সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠার পর দেখতে পাই আমি কোন একটা বাড়ির গ্যারেজের ভেতরে আছি। গ্যারেজের একদম শেষ মাথায় সিঁড়ি কেটে আন্ডারগ্রাউন্ড সিক্রেট শেল বানানো হয়েছে। সেখানেই আটকে রাখা হয়েছিল আমাকে। গ্যারেজটি একটি দ্বিতল বিশিষ্ট বাংলো বাড়ির। বাড়িটির চারপাশে উঁচু দেয়াল দ্বারা বেষ্টিত। চোখের পলকে ছুটতে ছুটতেই চারদিকে চোখ বুলালাম। দেয়াল ঘেষে একটা পেয়ারা গাছ দাঁড়ানো আছে। ছুটে পেয়ারা গাছ বেয়ে দেয়াল টপকানোর সময় গ্যারেজের দিকে চোখ গেল। দুজন কালো পোশাক পরিহিত লোক আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওদের দিক থেকে দৃষ্টি সরে চোখ পড়লো বাংলো বাড়ির দরজায়। দরজাতে মস্ত বড় এক তালা ঝুলছে। তবে উপরের তলার ঝুল বারান্দায় সদ্য ধুয়ে দেয়া কাপড় রোদে মেলে দেয়া হয়েছে। সব জামাকাপড়ের ভেতরে একটা জামার উপর আমার দৃষ্টি আটকে যায়।
হলুদ ও সাদা রেখা টানা একটা কুর্তি।
" ইলিয়ানার"
গায়ে বেশ কয়েকবার দেখেছি এ কুর্তি টি।
আগে পালাতে হবে পেয়ারা গাছে বসে বসে এ নিয়ে ভাবার সময় নেই।
লাফ দিয়ে দেয়ালের ওপারে গেলাম।
আশেপাশের বিলবোর্ড দেখে নিশ্চিত হলাম এটা উত্তরা সাত নম্বর সেক্টর।
নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, একটা প্রফেশনাল ভিক্ষুকের মত লাগছে আমাকে। হাতে টাকা পয়সাও নেই।
এই মুহূর্তে ভিক্ষা করে কিছু ইনকাম করলেও মন্দ হয়না।
দাঁড়ি গোফ তো আগে থেকেই বেশ লম্বা লম্বা হয়ে ছিল। তার উপরে এখন ছেড়া জামাকাপড়।
পকেট থেকে একটা পাকা পেয়ারা বের করে কামড় বসালাম। পালানোর সময়ে গাছে পেকে হলুদ হয়ে থাকা পেয়ারার বেশ কয়েকটা তুলে নিয়েছিলাম।
খেতে খেতে ছাত্রাবাসের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। ওখানের ছোট একটা কাজ শেষ করে আমাকে নিজ বাসায় ফেরত যেতে হবে খুব দ্রুত।
সবকিছু ঠান্ডা মাথায় চিন্তাভাবনা করে রাখলেও আমার মাথায় খুন চেপে আছে। মনের অভ্যন্তরীণ একটা পশু রক্তপিপাসায় কুকড়ে মরছে।
ওকে শান্ত করতে হবে রক্তিম হিংস্রতার খেলায়। আর সেটার জন্য আমার খুব দ্রুত বাসায় ফেরাটা জরুরি।
প্রায় দু ঘন্টা হাঁটার পরে মাতৃছায়া ছাত্রাবাসে পৌছালাম।
আসার পরেই শুনলাম এ ক'দিনে সিদ্দীক চৌকির নিচ থেকে বের হয়নি। শুধু উঠে বাথরুমে গিয়েছে আবার এসে চৌকির নিচে ঢুকেছে। ওকে লোক দিয়ে খাওয়া দাওয়া পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আমি শেষবার সিদ্দীক কে বলে গেছিলাম আমি আসার আগ পর্যন্ত যেন চৌকির নিচ থেকে বের না হয়। ও আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে জেনে মনের ভেতরে অন্যরকম একটা ভালোলাগা কাজ করতে লাগলো।
ঠিক করলাম, সিদ্দীককে আমার ভৃত্য হিসেবে পার্মানেন্ট জায়গা দিতে হবে। তবে আমার বেহাল অবস্থা দেখে সিদ্দীক এবং নতুন ম্যানেজার সহ অনেকেই দুঃখ প্রকাশ করলো এবং জানতে চাইলো কি হয়েছে!
শুধু উত্তর দিয়েছি আমাকে কিডন্যাপ করা হয়েছিলো।
মুহুর্তের ভিতর এ'কান ও কান করতে করতে খবরটা পৌঁছে গেল ছাত্রাবাসের মালিকের কাছে।
তিনি আমাকে জরুরীভাবে দেখা করার জন্য জোর তলব করলেন।
ম্যাচের ম্যানেজার নতুন জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করে আমার জন্য। ফ্রেশ একটা গোসল দিয়ে সেলুনে গিয়ে চুল দাড়ি ছোট করি। এরপর খাওয়া দাওয়া এবং বিশ্রাম পর্ব শেষে ম্যাচের মালিকের নিজস্ব শো রুমে দেখা করতে যাই।
.
.
কাঠের ফার্নিচারের শো রুম।
তাও আবার একটা বিল্ডিং এর সপ্তম তলায়।
শো-রুমে আছে কাঠের নানান আসবাবপত্র, ওগুলো ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করার জন্য একটা ছোকরাও রাখা হয়েছে। সাথেই লাগোয়া একটা ছোট্ট রুমে নিজের জন্য বিলাস বহুল বিছানা রেখে বিশ্রামের জায়গা করে নিয়েছেন তিনি।
দেয়াল জুড়ে রাজনৈতিক নেতাদের নির্বাচনী প্রচার প্রচারণার পোষ্টার লাগিয়ে রেখেছেন।
প্রথম দেখাতেই আগে জিজ্ঞেস করলাম, মাস তিনেক আগে শেষ হয়ে যাওয়া নির্বাচনে ব্যবহৃত হওয়া পোস্টার এখনো দেয়ালে সেটে রাখার প্রয়োজনীয়তা কি!
উনি উত্তরে জানালো, দুনিয়াতে একটু চালাক না হলে, টিকে থাকা খুব কঠিন।
যখন নির্বাচন চলছিলো তখন এই শো রুমের অস্তিত্ব ও ছিলো না।
পরে যে নির্বাচিত হয়েছেন তার নির্বাচনী প্রচার প্রচারণার পোস্টার স-যত্নে দেয়ালে সেটে রেখে খুব সহজেই তার সুদৃষ্টিতে আসা যায়।
তার বক্তব্য শুনে মনে মনে বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারলাম না।
ওনার সাথে আরো কিছুক্ষন কথা হলো।কথা বলে বুঝতে পারলাম,
আমি কিভাবে কি কিডন্যাপ হয়েছি,কিভাবে ছাড়া পেলাম, এটা শুনে বিনোদন নেয়ার জন্যই আমাকে ডাকা হয়েছে। ওনার কাছে আমার কিডন্যাপ ও বের হয়ে আসার বিষয়টি একটি এডভেঞ্চারের গল্পের মত উপভোগ্য এর বাইরে কিছুই না। আমিও ওনাকে খুশি করতে আরো সত্য ঘটনার সাথে ভয়ানক ও লোমহর্ষক কিছু বিষয় বর্ণনা করে ওনার শ্রবনযোগ্য করে তুললাম। বিনিময়ে রাতের ডিনারটাও ওনার সাথেই হয়ে গেলো।
আমার সাথে গল্প করে উনি বোধ হয় অনেক বেশি আনন্দ পেয়েছেন। ফেরার সময়ে হাতে কিছু টাকা গুজে দিয়ে আমাকে বললেন পরদিন আবার আসতে।
সালাম দিয়ে বের হয়ে আসলাম আমি।
ঘড়িতে দেখলাম - রাত ১১ টা ৪০ বাজে।
সিদ্ধান্ত নিলাম এ সময়ে নতুন একটা বাসা খুঁজতে বের হবো। আজ সারা রাত বাসা খুঁজবো।
টু লেট প্লেটে তো আর লেখা নেই যে রাতে কল দেয়া নিষেধ।
সুতরাং " রাতে কল করা যাবে না" নিজে নিজে এত বেশি বুঝে লাভ নেই।
সিদ্দীক ও আমি মেইন রাস্তা ধরে হেঁটে চলেছি।
উদ্দেশ্য সামনের একটা আবাসিক এড়িয়ায় ঢুকে ভাড়া নেয়ার জন্য নতুন বাসা খুঁজবো।
হঠাৎ করে আমার চোখ গেল নির্জন রাস্তায় চলতে থাকা একটা হুড নামানো রিক্সায়।
রিকশায় বসে থাকা মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমিও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি তার দিকে।
মেয়েটি আর কেউ নয়, "নীড়া"।
আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই রিকশা আমাদের ওভার করে চলে গেল দূর থেকে আরো দূরে।
মুহূর্তেই মাথাটা ঝিম ঝিম করতে শুরু করলো।
-পর্ব_১৩
মাথায় বেশি প্রেসার থাকলে মানুষ নাকি চোখে ভুলভাল দেখে। কিন্তু আমার মন মেজাজ তো একেবারে ফুরফুরে।
তবুও এই মুহুর্তে এ সময়ে নীড়াকে দেখলাম কিভাবে! যদি মেনেও নেই যে নীড়া মরেনি। আমার সামনে মারা যাওয়ার অভিনয় করেছে, তবুও ওর যে অবস্থা ছিলো তাতে উঠে হাঁটতে পারার কথা না।
তবে যার সাথে আমি বন্ডেজ সেক্স এ জড়িয়েছিলাম, সে কি নীড়া ছিল না?
অবশ্যই নীড়া ছিলো।
নীড়ার সাথে আমি বেশ অনেক দিন যাবৎ একত্রে কাজ করেছি। একটা মানুষ বর্তমান ডিজিটাল যুগে চেহারা চুরি করতে পারলেও চাল-চলন কথাবার্তা তা তো আর চুরি করতে পারবে না!
তবে কি নীড়ার কোন জমজ বোন আছে?
খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। চুপিচুপি অজ্ঞাতসারে কাউকে অনুসরণ অনুকরণ করলে অনেক ভয়ানক সব তথ্য বের হয়ে আসে।
যেমনটা বের হয়েছিলো মাষ্টার মাইন্ড মণিকার বেলায়।
মণিকার পেছনে বেশ কিছু সময় আমি ব্যয় করেছি। ওকে ফলো করেছি। ও যাদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের ফলো করেছি। তাদের সাথে অজ্ঞাত পরিচয়ে কথা বলেছি।
আর এ সব কিছু ঘাটতে ঘাটতেই বের হয়ে আসে ভয়ানক এক সত্য।
আমার স্ত্রী সাবিহার প্রাক্তন প্রেমিক ফারহানের ব্যপারে খুব ভালো ভাবেই জানতো মণিকা। কারণ সাবিহা মণিকাকে বিশ্বাস করে নিজের ব্যক্তিগত সব কিছু শেয়ার করেছিলো।
সাবিহার বাসা থেকে অন্যত্র বিয়ে ঠিক করে ফেলায় ও ফারহানের কাছে পালিয়ে চলে আসে। কিন্তু ফারহান সেদিন সাবিহার হাত আঁকড়ে ধরে রাখতে পারেনি।
ভাগ্যক্রমে সাবিহার সাথে পার্কে আমার দেখা এবং কথাবার্তা হয়।সেখান থেকেই আমি প্রথমে ওর অস্থায়ী, পরে একমাত্র এবং স্থায়ী আশ্রয় হয়ে উঠি।
আমাদের বিবাহিত জীবনে সাবিহাকে আমি ওর পরিবারের কোন সদস্যকে কখনো ফোন করতে দেখিনি। তাদের কথা ওর মুখে বলতেও শুনিনি এমনকি আমি ও বাদে ওর পরিবারের কাউকে চিনিওনা। এভাবেই কেটে যায় বেশ কিছুদিন। সময়ের আবর্তনে, শারিরীক এবং মানসিক চাহিদায় সাবিহা একজন মা হয়ে ওঠার প্রস্তুতি নেয়। যখন সাবিহার প্রেগন্যান্সির নিশ্চিত হয়, আমি অতি উৎসাহ নিয়ে আমার পরিবারের সবাইকে শুভ সংবাদ দেয়ার সাথে সাথে মিষ্টি মুখও করাই।
সাবিহাও তখন অনেক খুশি ছিলো। কিন্তু ওর এই খুশির বিষয়টি শেয়ার করার মত ওর নিজের পরিবারের ভেতরে তেমন কেউই ছিল না।
মস্তিষ্কের কোনা কানায় অনেক খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে মণিকার কথা মনে করে সাবিহা।মণিকার নাম্বার সাবিহার মুখস্তুই ছিল। ও শর্তসাপেক্ষে
স্ত্রী এবং মা হিসেবে নতুন জীবন শুরুর কথা মণিকার সাথে শেয়ার করে।
মণিকা তার সাইলেন্ট গেম প্লে শুরু করে তখন থেকেই।
কথায় কথায় সাবিহার কাছ থেকে অনেক কথা-ই জেনে নেয় মণিকা।
আমার ভালো চাকরি , সাবিহার সুখী জীবনের সাথে মণিকা নিজের সদ্য ব্রেকাপে মোড়ানো ভালোবাসাহীন একাকিত্ব জীবনটাকে পাশাপাশি দাঁড় করায়।
হয়ত কুরুচিপূর্ণ সিদ্ধান্তটা ঠিক এ সময়টাতেই ওর মাথায় ভর করেছিলো।
মণিকা সাবিহার প্রাক্তন প্রেমিক ফারহানের সাথে যোগাযোগ করে। সাবিহার বর্তমান সুখী জীবনযাপনের কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলতে থাকে ফারহান নিজেও।মণিকা স্বাভাবিক ভাবে আমার স্ত্রীর সাথে ফোন আলাপ অব্যাহত রাখে।
এরপর সাবিহা যখন তার প্রেগনেন্সির দিনগুলো আমার সাথে দুষ্টু মিষ্টি ভালোবাসা মাখিয়ে পার করছিলো,
ততদিনে মাষ্টারমাইন্ড গেইম প্লে করার জন্য নিজেদের স্টেজ নিঁখুতভাবে সাজাতে শুরু করেছিলো মণিকা ও ফারহান।
দেখতে দেখতে আমাদের সুন্দর ফুটফুটে একটা কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে।
প্লান অনুযায়ী জন্মের দিন দুইয়ের মাথায় মণিকা আমার স্ত্রীকে ফোন করে।
জানায় হুট করে ফারহানের খোঁজ পেয়েছে সে।
ফারহান সেদিন সাবিহাকে গ্রহণ করতে আসেনি কারণ ঠিক সে-দিন ই ফারহানের ক্যান্সারের প্রাথমিক স্টেজ ধরা পরে।
কেমোথেরাপি নিয়ে এতদিন জীবনের সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকলেও এখন ফারহান হাসপাতালের বেডে তার অন্তিম মুহুর্তের প্রহর গুনে চলেছে।
স্বভাবিক ভাবেই সাবিহা এ খবরটি শুনে একদম ই ভেংগে পরে।
মেসেঞ্জারে ছবি পাঠিয়ে ফারহানের মেডিকেল রিপোর্ট দেখায় মণিকা। হাসপাতালের বেডে শোয়া অবস্থায় ফারহানের ছবিও শেয়ার করে।
আর সেদিন মাঝ রাতেই আসে ফারহানের ফোন।
জীবনের অন্তিম মূহুর্তের দোহাই দিয়ে ফারহান সাবিহাকে বলে ,
আমার ও সাবিহার কন্যা সন্তানের নাম তাদের ভালোবাসা চলাকালীন সময়ে ঠিক করে রাখা নামে রাখতে।
সাবিহা তার আবেগের কাছে পরাজিত হয়ে সেটাই করে। এরপর মণিকা সাবিহার সহোযোগিতার জন্য আমাদের বাসায় এসে ওঠে। ওদের ষড়যন্ত্রের পথ আরো সুগম হয়। সাবিহাকে মণিকাই বিভিন্ন কথা বলে ফারহানের কাছে পাঠাতো। সাবিহা গিয়্র দেখতো ফারহান হাসপাতালের বেডে মুমূর্ষু অবস্থায় শুয়ে আছে।
ফারহান ও মণিকা দুজনেই সাবিহাকে বুঝায়,
ফারহান যে কোন সময়ে মারা যেতে পারে। ওর চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া দরকার কিন্তু প্রয়োজনীয় আর্থের নির্ভরযোগ্য উৎস নেই।
এভাবেই শুরু হয় সাবিহার কাছ থেকে টাকা পয়সা লুটপাট করার প্রক্রিয়া।
এর মাঝে সাবিহা একদিন ফারহানকে দেখতে হাসপাতালে গেলে মণিকা ইচ্ছে করেই আমার শিশু বাচ্চাটির গলায় চুলের ক্লিপ ঢুকিয়ে দেয়। আমি যাতে সাবিহার উপর ক্ষেপে গিয়ে ওকে ডিভোর্স দেই এবং আমার দেনমোহরের টাকা পেয়ে সাবিহা সেটা ফারহান এবং মণিকার কাছে তুলে দেয় এজন্যই এমন একটা জঘন্য প্লান করেছিলো ও।
কাকতালীয় ভাবে পাঠাও রাইড নিয়ে বাসায় আসার সময়ে আমি সাবিহাকে বাইকের পেছনে দেখে ওকে ভুলভাবে সন্দেহ করি।
তবে সন্দেহ করলেও আমি ভুলভাল কোন স্টেপ বা সিদ্ধান্ত নেইনি এজন্য নিজেই নিজেকে হাজারবার স্যালুট জানাচ্ছি এখন।
ধৈর্যশীল মানুষরা সব সময়ই কোন না কোন ভাবে জিতে যায়।
যাই হোক,
যখন ফারহান এবং মণিকা দেখলো তাদের প্লান কাজ করছেনা তখন ফারহান আমাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে করে আমার জমানো সব টাকা পয়সা এবং জায়গা জমি সাবিহার নিজের হয়ে যাবে,
যেটা ও ফারহানের চিকিৎসার জন্য ব্যয় করবে এবং একটা পর্যায়ে যার বড় একটা অংশের মালিক হবে মণিকা এবং ফারহান।
আগের প্লান ঠিকঠাক ভাবে কাজ না করলেও এবারের প্লান টা ঠিক ই কাজ করে। আমার ফেক পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বানিয়ে, অফিসিয়ালি আমাকে মৃত ঘোষনা করা হয়।
হাসপাতালের রিসিপশন ক্যাশিয়ারের থেকে শুরু করে কয়েকজন নার্সরা মিলে শুধু সাবিহা নয়, সাবিহার মত অনেকের কাছ থেকেই এভাবে কন্টিনিউয়াসলি টাকাপয়সা আত্মসাৎ করতে শুরু করে ফারহান এবং মণিকা।
যত দ্রুত সম্ভব আমাকে সাবিহার সাথে যোগাযোগ করে সবকিছু ওকে খুলে বলতে হবে৷ তবে ফারহানের হাত আন্ডারগ্রাড পর্যায়ে একটু বিস্তৃত।
হুটহাট কোন সিদ্ধান্ত নেয়া যাবেনা।
সবথেকে ভালো হবে অত্যন্ত গোপন জায়গায় কোন একটা বাসা খুঁজে সেখানে সাবিহা ও আমার মেয়েকে নিয়ে আসলে। মাথায় অনেক বিষয় গন্ডোগোল পাকিয়ে আছে।
মৃত নীড়া, জীবিত নীড়া, ইলিয়ানা, বন্ডেজ ক্লাব ঘরের রহস্য, ফারহান এবং মণিকা এসব কিছুর ঘোর কাটিয়ে উঠে খুব স্বাভাবিক একটা জীবনে ফিরে যাওয়াটা কি আদৌ সম্ভব হবে আমার!
এসব কিছুর টানাপোড়েন এ আমার বাক শক্তি হারানো ফুটফুটে মেয়েটার ভবিষ্যৎ নিয়েও আমি চিন্তিত।
মণিকার পশুত্বের কারণে আমার মেয়েটা তার কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছে এটা যখন ই মনে হয়,
ইচ্ছে করে ওর জিহবা বের করে একটা খুটির সাথে লোহা মেরে আটকে রাখি।
এখন রাগ করার সময় না।
যা করতে হবে সব কিছু ঠান্ডা মাথায় করতে হবে।
সিদ্দীকের কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে সাবিহার সাথে কথা বলার জন্য ওর ফোনে একটা ফোন দেই আমি।
বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোন পিক করে কেউ একজন।
এতদিন পরে বহুল পরিচিত ভালোবাসা মাখা কন্ঠ টা শুনব এমনটা আশা থাকলেও
ওপাশ থেকে পাতলা একটা পুরুষ কন্ঠ শুনতে পাই আমি।
" এতক্ষন এই কলটার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম, মিষ্টার শহর, ওরফে ফাহাদ।
তুমি পাতায় পাতায় চললেও আমি পাতার শিরায় উপশিরায় চলি।
বরশিতে আটকে পরা মাছের মত তুমি আমার হাতে আটকে গেছ।
যতই ছুটাছুটি করো, তোমার ভাগ্যের শেষ লেখা হলো তুমি মাছের মতই শেষমেশ শিকারির ব্যাগে প্যাকেট হবে।
সাবিহা এবং তোমার কন্যা,
আমার কাছে বন্দী অবস্থায় আছে। আগের বাসায় খুঁজে লাভ নেই ওরা আমার কাছে গোপন জায়গায় আছে। এবার তোমার বরশির মাছের মত ব্যাগের ভেতর চলে আসার পালা। বাই দ্যা ওয়ে আমার পরিচয় নিশ্চয়ই আঁচ করতে পেরেছো,তবুও বলছি,
আমি ফারহান।
ফোনটা কেটে দিলাম।
নিজেকে বড্ড ভাংগাচোরা লাগছে।
পৃথিবীর কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ ছাড়া কি আর কিছু করার আছে আমার??
হঠাৎ মনে পড়লো রুই কাতলা ধরার মাছের বরশিতে যদি কখনো হাঙ্গর আটকে যায়, তাহলে সেটা মাছ শিকারীর জন্য বিপদজনক হয়ে ওঠে।
সুতরাং নিজেকে অসহায় শিকারে পরিণত করার থেকে আরো বেশি শক্তিশালী সত্তায় পরিণত করতে হবে।
সামনে যে এক কঠিন যুদ্ধ বাকি আমার।
-পর্ব_১৪
______________________
যেহেতু আমার গোপন করা পরিচয় ওরা জেনে গিয়েছে তার মানে আমি শতভাগ নিশ্চিত হলাম যে ইলিয়ানা কোনো না কোনো ভাবে ওদের সাথে জড়িত।
নগরীর দেয়াল গুলো নতুন পুরাতন টু লেট বিজ্ঞাপন হাতে অনেক দায়িত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রাত দুটা বেজে পনের মিনিট। সিদ্দীকের ফোন থেকে একটা চকচকে টু লেট বিজ্ঞাপনে ফোন দিলাম।
বেশ কয়েকবার রিং হওয়ার পর ফোন পিক করলো একজন মাঝবয়েসী লোক।
- হ্যালো.... কে....
- জ্বী বাসা ভাড়া নেয়ার জন্য ফোন দিয়েছিলাম।
- ফাযলামী পাইছেন মিয়া! রাইতের বেলা ঘুম নষ্ট করে বাসা ভাড়া খুঁজতেছেন?
- আপনি কি বাসার মালিক?
- না আমি এই বাড়ির দারোয়ান।
- দারোয়ান হইলে তুমি রাতে ঘুমাও কেন? তোমার দায়িত্ব রাতে গেটে দাঁড়িয়ে পাহারা দেওয়া।
কাজে ফাঁকিবাজি করো আবার চিল্লাচিল্লি করছ?
- আচ্ছা আপনে কামের কথা কন। কি জানতে চান?
- নাহ তোমার মত কাজে ফাঁকি দেয়া দারোয়ান যে বাড়িতে আছে সে বাড়িতে আমি উঠবো না৷ আমার মালামাল সব চুরি হয়ে যাবে।
বলে ফোন কেটে দিলাম।
সিদ্দীক দেখি আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিট করে হাসছে।
যাক ওর আমার সাথে হাঁটতে যে বোরিং লাগছে না এটাই ঢেড়।
কিছুক্ষন পরে ফোন দিলাম অন্য একটি বাসা ভাড়ার বিজ্ঞাপনের নাম্বারে।
এবার ও ফোন রিসিভ হলো।
ফোন ধরেই ছেলেটা বললো,
-"হ্যা" সোনা বলো।
- এক্সকিউজ মি, বাসা ভাড়ার নেয়ার জন্য ফোন দিয়েছিলাম।
- জানি সোনা। তোমার মত আমাকে কেউ ভালোবাসেনা।
আমিও তোমাকে মিস করি খুব।
( পাশ থেকে কান্নাজড়িত নারী কন্ঠে কেউ একজন বলছে,
দেখো শাহেদ তুমি আমাকে ভুল বুঝছো।আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, প্লিজ তুমি অন্য কারো সাথে কথা বলে আমাকে কষ্ট দিওনা। আমার সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে আমি তোমার সব শূন্যতা - পূর্ণ করে দিব।
মেয়েটা তার কথা চালিয়ে যাচ্ছিলো আমি ফোনটা কেটে দিলাম।
পারিবারিক কলহ হয়ত।
ছেলেটা এমন একটা ভাব করেছে যে সে তার প্রাক্তন প্রেমিকার সাথে কথা বলছে, হয়ত তার স্ত্রীর কোন আচরণে কষ্ট পেয়েই এমন একটা অভিনয় করলো।
আরো বেশ কিছু নম্বরে কল দিলাম, কয়েকটা ফোন রিসিভ হয়নি। মাঝে একটা ফোন রিসিভ হওয়ার পর একটা বাচ্চার হাসির শব্দ শুনতে পেয়েছি শুধু। বাবা মা সহ ঘুমিয়ে যাওয়ার পর হয়ত কলের সাউন্ডে বাচ্চাটার ঘুম ভেংগে যায়। আলোর ফোয়ারা দেখে ফোন হাতে নেয়ায় চাপ লেগে রিসিভ হয়ে যায় ফোনটি।
বেশ কিছুক্ষন ধরে ওর হাসির শব্দ শুনি আমি।
এরপর নিজ থেকেই ফোনটি কেটে যায়।
মানুষের জীবনের রাতের গল্পগুলো যে কতটা ভিন্ন তা আমি মাঝরাতে কল না দিলে কখনোই বুঝতাম না।
কিছু গল্প একান্ত রাতের ই থাকে যা কখনো দিনকে বলা হয়ে ওঠে না।
শেষবার যাকে কল দিলাম, তার কণ্ঠ শুনেই বোঝা যাচ্ছিলো সে এখন বাসার বাইরে আছে। ফুরফুরে ফ্রেশ মেয়েলি কন্ঠস্বর।
এত রাতে বাসা খোঁজার জন্য কল করেছি দেখে মোটামুটি সবাই বিরক্ত হলেও মেয়েটাই প্রথম জিজ্ঞেস করলো, ভাইয়া আপনি কি বড় কোন বিপদে পড়েছেন?
জবাবে বললাম, বিপদ আমার উপরে এসে পড়েছে।
মেয়েটা আমাকে মিনিট পাঁচেক অপেক্ষা করতে বললো।
পাঁচ মিনিট পরে মাথায় হেলমেট, কনুই ও হাঁটুতে আর্মর লাগানো একটা মেয়ে স্কেটিং করতে করতে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো।
জিজ্ঞেস করলো আমরাই বাসা ভাড়া নেয়ার জন্য কল করেছি কিনা!
জবাবে জানালাম হ্যাঁ।
মেয়েটি পুনরায় প্রশ্ন করলো,
খেয়েছেন কিছু? দেখে তো মনে হচ্ছে খাওয়া দাওয়া হয়নি আপনাদের। ভেতরে চলুন,আমার সাথে খাবেন।
সাহস ভালো, কিন্তু দুঃসাহস ভালো না। মেয়েটি যা করছে সেটা এক প্রকার দুঃসাহসিক কাজ, আমরা যদি প্রফেশনাল ডাকাত হতাম,তবে এর কপালে আজ ভীষন খারাপ কিছু ছিলো।
যেতে যেতে মেয়েটি বললো, নতুন স্কেটিং শিখছি, তাই অনেক রাতে স্কেটিং করতে বের হই। রাস্তা একদম ফাঁকা থাকে।কথা বলা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ঘেউ ঘেউ করে দুবার কুকুরের ডাক শুনলাম। মেয়েটির পায়ের দিকে ভালোভাবে খেয়াল করে দেখলাম পা ঘেষে সাদা লম্বা লোমযুক্ত একটা কুকুর দাঁড়ানো। আমার দৃষ্টি কুকুরটার দিকে দেখে মেয়েটি বললো, এ হলো আমার সবথেকে কাছের বন্ধু, " প্লুটো"।
যখন মেয়েটিকে অনুকরণ করে ওর বাসায় ঢুকলাম, তখন আমার ধ্যান ধারণা পুরোপুরিভাবে বদলে গেল।
কারো কারো ক্ষেত্রে দুঃসাহস করাটাও জায়েজ আছে।যখন গেট থেকে ভেতরে ঢুকতে গেলাম, তখন দেখলাম গেটে দুজন কর্তব্যরত পুলিশ দাঁড়ানো। মুহূর্তেই বুঝে নিলাম পুলিশের কোন উর্ধতন কর্মকর্তা বা বড় কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের বাড়ি এটা।
পুরো বাড়িটা সিসি ক্যামেরার আওতাভুক্ত।
আমাদের নিয়ে বসানো হলো নিচতলার বিশাল এক গেস্টরুমে। এখানটা শুধুমাত্র গেস্টদের জন্য ব্যবহার করা হয়।মেয়েটা আমাদের বসিয়ে দিয়ে চলে গেল। একটু পর কিছু কর্মচারী এসে আমাদের মুখরোচক সব খাবার দাবার খেতে দিল।
গেস্ট রুমে বিশ্রামের ব্যবস্থাও ছিল। কর্মচারী আমাদের জানালো, যাতে আমরা খেয়েদেয়ে রেস্ট নেই। সকালে আমাদের সাথে ওনার ম্যাডাম কথা বলবে।
খেয়েদেয়ে বিশ্রামের জন্য বসলাম। ঘুমানোর ব্যবস্থা থাকলেও এখন ঘুম আসবেনা। আগে নিজের সাথে কথা বলতাম। এখন তাও কথা বলার জন্য সিদ্দীক আছে।
ওকে ডেকে বললাম, বুঝলে সিদ্দীক, ম্যাচের মালিকের বিষয়টা আমার কাছে অত্যন্ত রহস্যজনক বলে মনে হয়েছে।
সিদ্দীক মনোযোগ সহকারে আমার মুখের দিকে তাকালো।
বললো কিভাবে?
- কেউ এমন একটা জায়গায় কেন শো রুম দিবে, যেটা লোকচক্ষু থেকে অন্তরালে?
মনে হয়না ওনার ওখানে তেমন বেশি একটা বেচাকেনা হয়।
তবুও এত টাকার শো রুম নিয়ে বসার উদ্দেশ্য কি!
- তাইতো! বুঝতে পারছিনা। উদ্দেশ্য কি!
-এটা আমি ঢাকা শহরের বেশ কিছু জায়গায় খেয়াল করেছি। খুব দামি দামি আসবাবপত্র সহকারে এমন এমন জায়গায় বড় বড় শো রুমের স্টল দেয়া হয়, যেখানে মানুষ সপ্তাহের পর সপ্তাহ উঁকি দিয়েও হয়ত দেখে না। বেঁচাকেনা একদম ই নেই। তবুও স্টলগুলো বছরের পর বছর টিকে থাকে।
- এর পেছনে কারণ কি হতে পারে?
- একটা ব্যখ্যা আমার কাছে আছে।
- কি ব্যখ্যা?
- এই যে ধরো যারা এমনটা করে, তাদের কোন না কোন ভাবে অবৈধ লেনদেনের সাথে জড়িত।
এদের প্রচুর ব্লাক মানি থাকে। কখনো আইনী ভাবে নোটিশ দিয়ে এ টাকার উৎস কোথায় তা জানতে চাওয়া হয়, তখন এসব শো রুম থেকে কেনা বেচার একটা হিসেব দেখিয়ে দেয়া যায়।
ব্লাক মানিকে হোয়াইট মানি করার একটা প্রসেস মাত্র।
সিদ্দীক মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো, তার মানে আমাদের ঐ ম্যাচের মালিকের ব্লাক মানির সোর্স আছে?
- তার নেই। তবে তার স্ত্রীর আছে।
- আপনি কিভাবে জানলেন?
সেটা বলবো, তার আগে আমাকে বন্ডেজ ক্লাবটায় ঢোকার ব্যবস্থা কর সিদ্দীক।
সব রহস্য ওখানেই লুকিয়ে আছে, সব।
- আমি কিভাবে ব্যবস্থা করমু স্যার!
- তোমার ম্যাডাম বন্ডেজ ক্লাবে যেত, রাইট?
- হুম।
- তাহলে ওখানে প্রবেশের নিয়ম কানুন তোমার জানা আছে।
- ম্যাডাম একটা কার্ড ইউজ করত। ওটা সাথে রাখলে ঢোকার সময় কেউ বাঁধা দেয় না।
- কার্ড টা তোমার ম্যাডাম কোথায় রাখতো? তুমি জানো?
- ওনার রুমে খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে।
- আচ্ছা তুমি যেহেতু ঐ বাড়িতে দাড়োয়ানের কাজ করতে, বাড়িটা তোমার হাতের নকশার মত চেনা।
তুমি আমাকে বাড়িটার কোথায় কি আছে তা খুলে বলো ভালো করে।
- আপনে কি ঐ বাড়িতে ঢোকার প্লান করতেছেন।
- হুম, তুমি শুধু আমাকে বলো বাড়িটার কোন পাশে কি কি আছে! কিভাবে ঢোকা যায় সেটা আমি বের করবো।
- কিন্তু, আপনাকে বন্ডেজ ক্লাবে কেন ঢোকা লাগবে? এছাড়া কোন উপায় নেই?
- সিদ্দীক তোমাকে বলেছিলাম না ঐ ম্যাচের মালিককে আমার সন্দেহজনক মনে হয়েছে?
- হুম।
- সে নিয়মিত বন্ডেজ ক্লাবে যায়। তবে তার ক্ষেত্রে আরো একটা জঘন্য বিষয় আমি উদঘাটন করেছি। সে একজন সমকামী।
- কিভাবে উদঘাটন করলেন?
- তার শো রুমের কর্মচারী ছেলেটিকে অবজারভার করে।
-পর্ব_১৫
______________________
মেয়েটা আমাদের বসিয়ে দিয়ে চলে গেল। একটু পর কিছু কর্মচারী এসে আমাদের মুখরোচক সব খাবার দাবার খেতে দিল।
গেস্ট রুমে বিশ্রামের ব্যবস্থাও ছিল। কর্মচারী আমাদের জানালো, যাতে আমরা খেয়েদেয়ে রেস্ট নেই। সকালে আমাদের সাথে ওনার ম্যাডাম কথা বলবে।
খেয়েদেয়ে বিশ্রামের জন্য বসলাম। ঘুমানোর ব্যবস্থা থাকলেও এখন ঘুম আসবেনা। আগে নিজের সাথে কথা বলতাম। এখন তাও কথা বলার জন্য সিদ্দীক আছে।
ওকে ডেকে বললাম, বুঝলে সিদ্দীক, ম্যাচের মালিকের বিষয়টা আমার কাছে অত্যন্ত রহস্যজনক বলে মনে হয়েছে।
সিদ্দীক মনোযোগ সহকারে আমার মুখের দিকে তাকালো।
বললো কিভাবে?
- কেউ এমন একটা জায়গায় কেন শো রুম দিবে, যেটা লোকচক্ষু থেকে অন্তরালে?
মনে হয়না ওনার ওখানে তেমন বেশি একটা বেচাকেনা হয়।
তবুও এত টাকার শো রুম নিয়ে বসার উদ্দেশ্য কি!
- তাইতো! বুঝতে পারছিনা। উদ্দেশ্য কি!
-এটা আমি ঢাকা শহরের বেশ কিছু জায়গায় খেয়াল করেছি। খুব দামি দামি আসবাবপত্র সহকারে এমন এমন জায়গায় বড় বড় শো রুমের স্টল দেয়া হয়, যেখানে মানুষ সপ্তাহের পর সপ্তাহ উঁকি দিয়েও হয়ত দেখে না। বেঁচাকেনা একদম ই নেই। তবুও স্টলগুলো বছরের পর বছর টিকে থাকে।
- এর পেছনে কারণ কি হতে পারে?
- একটা ব্যখ্যা আমার কাছে আছে।
- কি ব্যখ্যা?
- এই যে ধরো যারা এমনটা করে, তাদের কোন না কোন ভাবে অবৈধ লেনদেনের সাথে জড়িত।
এদের প্রচুর ব্লাক মানি থাকে। কখনো আইনী ভাবে নোটিশ দিয়ে এ টাকার উৎস কোথায় তা জানতে চাওয়া হয়, তখন এসব শো রুম থেকে কেনা বেচার একটা হিসেব দেখিয়ে দেয়া যায়।
ব্লাক মানিকে হোয়াইট মানি করার একটা প্রসেস মাত্র।
সিদ্দীক মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো, তার মানে আমাদের ঐ ম্যাচের মালিকের ব্লাক মানির সোর্স আছে?
- তার নেই। তবে তার স্ত্রীর আছে।
- আপনি কিভাবে জানলেন?
সেটা বলবো, তার আগে আমাকে বন্ডেজ ক্লাবটায় ঢোকার ব্যবস্থা কর সিদ্দীক।
সব রহস্য ওখানেই লুকিয়ে আছে, সব।
- আমি কিভাবে ব্যবস্থা করমু স্যার!
- তোমার ম্যাডাম বন্ডেজ ক্লাবে যেত, রাইট?
- হুম।
- তাহলে ওখানে প্রবেশের নিয়ম কানুন তোমার জানা আছে।
- ম্যাডাম একটা কার্ড ইউজ করত। ওটা সাথে রাখলে ঢোকার সময় কেউ বাঁধা দেয় না।
- কার্ড টা তোমার ম্যাডাম কোথায় রাখতো? তুমি জানো?
- ওনার রুমে খুঁজলে পাওয়া যেতে পারে।
- আচ্ছা তুমি যেহেতু ঐ বাড়িতে দাড়োয়ানের কাজ করতে, বাড়িটা তোমার হাতের নকশার মত চেনা।
তুমি আমাকে বাড়িটার কোথায় কি আছে তা খুলে বলো ভালো করে।
- আপনে কি ঐ বাড়িতে ঢোকার প্লান করতেছেন।
- হুম, তুমি শুধু আমাকে বলো বাড়িটার কোন পাশে কি কি আছে! কিভাবে ঢোকা যায় সেটা আমি বের করবো।
- কিন্তু, আপনাকে বন্ডেজ ক্লাবে কেন ঢোকা লাগবে? এছাড়া কোন উপায় নেই?
- সিদ্দীক তোমাকে বলেছিলাম না ঐ ম্যাচের মালিককে আমার সন্দেহজনক মনে হয়েছে?
- হুম।
- সে নিয়মিত বন্ডেজ ক্লাবে যায়। তবে তার ক্ষেত্রে আরো একটা জঘন্য বিষয় আমি উদঘাটন করেছি। সে একজন সমকামী।
- কিভাবে উদঘাটন করলেন?
- তার শো রুমের কর্মচারী ছেলেটিকে অবজারভার করে।
সিদ্দীকের সাথে কথা বলতে বলতেই ঘুমের কোলে ঢলে পড়লাম আমি।
.
.
.
.
অবশেষে এ বাসাতেই একটা যথোপযুক্ত জায়গা পেলাম থাকার জন্য। একেবারে ছাদের চিলেকোঠায় দু রুমের একটা ফ্লাট পেলাম।
আমাদের এখানে থাকার জন্য অবশ্য কিছু শর্ত পালন করে চলতে হবে।
ছাদের উপরে থাকা অগণিত চেনা অচেনা বাহারী ফুলগাছ গুলোতে প্রত্যহ সকালে পানি দিতে হবে,প্রতি মাসের দশ তারিখের ভেতরে ভাড়ার টাকা পরিশোধ করতে হবে।
খুবই সাধারণ শর্ত। মেনে নিয়ে চিলেকোঠাতেই উঠে গেলাম।
তবে অদ্ভুত বিষয় হলো,যে মেয়েটি আমাকে এখানে নিয়ে এলো তার সাথে আমাদের আর দেখা হয়নি। যত কথা হয়েছে, সব কিছুই হয়েছে কেয়ার টেকার এর সাথে।এ বাসার কেয়ারটেকার লোকটাও অনেক আন্তরিক।
সিদ্দীক কে বললাম, সিদ্দীক?
বাসায় তো উঠেছি। কিন্তু আমাদের তো বাসায় কিছুই নেই। না আছে ঘুমানোর জন্য একটা তোষক, না আছে পানি খাওয়ার মত একটা গ্লাস। কি করা যায় বলতো!
সিদ্দীক ওর নিজের মাথা চুলকালো কিছুক্ষন।
বুঝলাম, এ প্রশ্নের কোন উত্তর ওর কাছে নেই।
নিজের ই যা করার করতে হবে।
ম্যাচের মালিকের সাথে আজকেই দেখা করতে হবে। লোকটার প্রচুর টাকাপয়সা থাকলেও, স্বভাবে ভীষন কিপটে।
না- না, আমার দৃষ্টিভঙ্গি উলটো,
আসলে ব্যপারটা এমন, লোকটা ভীষণ কিপটে বলেই এত টাকা পয়সার মালিক হয়েছে।
ওনার কাছ থেকেই সাহায্য নিতে হবে। তবে সাহায্য কেউ কাউকে এমনি এমনি করে না। ভবিষ্যতে যদি আমাকে দিয়ে তার কোন উপকার হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তবে আমি তার কাছ থেকে সাহায্য পাব না।
সুতরাং তার কাছে নিজেকে প্রয়োজনীয় করে তোলাটা ভীষণ জরুরি।
এদিকে সিদ্দীক কে ছোট খাট একটা কাজ দিলাম।
ফারহান যে হাসপাতালে ক্যান্সারের রোগী হওয়ার নাটক করে অনেক মানুষের কাছ থেকে টাকা পয়সা লুট করছে, সেখানে পাঠালাম সিদ্দীক কে। ওর কাজ হলো ফারহান কে ফলো করা। ফারহান কখন কোথায় কেন যায় সবকিছু আমাকে ডিটেইলস এ জানানো।
সিদ্দীক এ গুরু-দায়িত্ব মাথায় নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেল।
আমি পাঁয়ে হেটেই রওনা দিলাম আমার গন্তব্যে।
যখন পৌঁছালাম, তখন খুব তেষ্টা পেয়েছে। ধনকুব ম্যাচ মালিকের, কাঠের ফার্ণিচারের শো রুমে ঢুকেই হাঁপাতে হাঁপাতে বললাম, এক-গ্লাস পানি!!
হাসান খুব দ্রুত আমার জন্য ফ্রীজ থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি বের করে দিলো।
ঢকঢক করে পুরো গ্লাসের পানি সাবার করে দিলাম।
বাবুমিয়া চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বাবু-মিয়া হলো ধনী ম্যাচ- মালিকের নিকনেম। যদিও এটা তার জন্মনিবন্ধনকৃত নাম নয়।তার বাবুমিয়া নামের পেছনে একটা মারাত্মক ইন্টারেস্টিং গল্প আছে, সেটা তিনি আমাকে শোনাবেন শোনাবেন করে এখনো শোনান নি। যাই হোক,
তিনি আমার দিকে বিষ্ফোরিত চোখে তাকিয়ে বললেন! ব্যাপার কি! হয়েছে তোমার!
কিডনাপার রা আবার ধাওয়া দিলো নাকি!
আমি তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললাম,
না, জনাব। তেমন কিছু নয়।
কিন্তু আরো ভয়াবহ কিছু।
তিনি আরেকটু সামনে ঝুঁকে বসে দু হাত গালে দিয়ে মনোযোগী ভঙ্গীমায় বসে জিজ্ঞেস করলেন!
-খুলে বলো তো! ঘটনা কি!
- খবরের কাগজ কি পড়েন না আজকাল?
- না পড়া হয়না।
- শহরে নতুন এক গ্যাং নেমেছে।
যারা মানুষকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করে, তার জীবনের গোপন ইচ্ছে কি! এবং সেটা তারা যে কোন উপায়ে পূরণ করে দেয়ার চেষ্টা করে।
- এটা তো অদ্ভুত এবং ভালো খবর। খারাপ বা ভয়াবহ খবর কি!
- গোপন ইচ্ছেটা পূরণ করার পর, ভিক্টিম কে" হত্যা" করা হয়।
হুট করেই হত্যা করা হয় এমন ভাবে বললাম, বাবুমিয়ার শরীর একটু ঝাঁকি দিয়ে উঠলো।
জিজ্ঞেস করলো, কারা এ কাজ করছে এবং কাদের কাছে এমন কল যাচ্ছে?
- সিদ্দীক কে চিনেন?
- তোমার সাথে যে লোকটা ছিলো সে?
-হুম। খুব সম্ভবত ও যে বাসার দাঁড়োয়ান ছিলো, সে বাসার মালিককে দিয়ে এমন কার্যকলাপের শুরু৷ এরপর বেশ কয়েকজনের সাথেই সেম ঘটনা ঘটেছে। এমনকি আমার সাথেও। আমাকেও ফোন করা হয়েছিলো।
শেষ ইচ্ছে জানতে চেয়েছে। আমি বলিনি। এজন্যই হয়ত কিডন্যাপ করার পর আমাকে খুন না করে বন্দী করে রাখা হয়েছিলো শুধু।
পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী,
প্রায় বারো জন মানুষ ঐ গ্যাং এর হাতে শিকার হয়েছে। সবার ফোনের কল রেকর্ড ঘেটে একই তথ্য পাওয়া গেছে৷পুলিশ এখন পর্যন্ত কাউকেই আটক করতে পারেনি।
- এটা তো মহা সর্বনাশের কথা।
আমার কাছে এমন কল আসলে আমার কি করা উচিৎ হবে?
- সেটা ভাবার সময় আমার কাছে নেই জনাব। আমার মাথায় এখন অন্য চিন্তা!
- কি চিন্তা!
- ঐ গ্যাং এর সাথে যুক্ত একজন আমার স্ত্রী ও ওয়াইফ কে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে।
গত কাল রাতে আমি এ খবরটি পাই।
ওদের উদ্ধার করার পরিকল্পনা করছি।
- পুলিশে জানিয়েছ?
- লাভ নেই।এর থেকে নিজে নিজে ওদের উদ্ধার কার্যে নেমে পড়ব। এটা বেশি এডভেঞ্চারের। রোমাঞ্চকর লোমহর্ষক একটা গল্প হবে। আপনি শুনে মজা পাবেন।
- শুনব মানে! আমি নিজেও তোমার সাথে এ অপারেশন এ যুক্ত হব। আমাকে কি করতে হবে, তা বলবে।
- আপনাকে কিছু করতে হবে না শারিরীক ভাবে। আমার কাছে এখন এমন একটা মিশন পরিচালনা করার মত অর্থ নেই। আপনি আমাকে আর্থিক সহযোগিতা করলেই হবে।
- ওটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবেনা।
কিন্তু তুমি কিভাবে কি করবে তা আমার কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার খুব ইচ্ছে জাগছে। আমাকে বিশ্বাস করে সাথে নিতে পারো।
- বেশ আপনি থাকবেন আমার সাথে। তবে একটা সহজ ধারণা দেই আগে আপনাকে।
যে বা যারা,
লোকজন দের ফোন দিয়ে আনটোল্ড ডিজায়ার বা গোপন অভিব্যক্তির কথা জিজ্ঞেস করে এবং হত্যা করে, সেই দলের লোকজনদের সাথে আমার কোন প্রকার চেনাজানা বা সম্পর্ক লেনদেন কিংবা ঝামেলা নেই।
আমার ঝামেলা ফারহান নামের এক আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়ার সাথে।
ফারহান ঐ খুনী গ্যাং এর সাথে কোনভাবে কানেক্টেড হয়েছে এবং আমার পিছু লেগেছে। তবে এর ভেতরে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, বন্ডেজ ক্লাব। আমার ইনভেস্টিগেশন বলছে আপনিও বন্ডেজ ক্লাবে যাতায়াত করেন। দেখুন সেটা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই। তবে আমাকে আপনি সাহায্য করতে চাইলে অবশ্যই বন্ডেজ ক্লাব সম্পর্কে সকল তথ্য আমাকে দিতে হবে। কারণ সকল রসুনের গোড়ার মত সবকিছুর সাথে ঐ ক্লাবটি ই যুক্ত আছে।
বাবুমিয়া আমার কথা শুনে রুমাল বের করে নিজের কপালের ঘাম মুছলেন। আমার হাতে ৫০০ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বললেন, এখনকার মত চলে যেতে।তিনি আবার যখন ফোন করবেন, তখন আমাকে দেখা করতে হবে। তার শো-রুম থেকে উঠতে উঠতে বললাম, আমার কাছে আমার স্ত্রী এবং কন্যা অনেক বেশি ভালোবাসা ও আদরের। আপনার সাথে আর দেখা হয় নাকি, আমি জানিনা। যদি বেঁচে থাকি, কোন একদিন দেখা হবে।
তিনি কিছু না বলে চেয়ারে হেলান দিয়ে চুপচাপ রইলেন। আমি দরজা ঠেলে বাইরে বের হয়ে আসলাম। পায়ে হেঁটে কাছাকাছি একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে বিরিয়ানির অর্ডার দিলাম।
প্রিয় খাবার খেলে, মন ভালো থাকে। মুক্তভাবে চিন্তাভাবনা করা যায়।
যা করতে হবে তা ঠান্ডা মাথায় করতে হবে।
বাসায় ফিরে দেখলাম সিদ্দীক বিমূর্ত হয়ে বসে আছে। আমার দেয়া তথ্য অনুযায়ী কোন কিছুই মিল পায়নি সে। তবে খোঁজখবর নিয়ে জেনেছে রিসেন্টলি ওখান থেকে বেশ কিছু এমপ্লয়ি রিজাইন করে চলে গেছে এবং সেখা নতুনদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
বুঝে নিলাম, ফারহান তার আখের গুছিয়ে দলবল নিয়ে সেভ জায়গায় গিয়েছে৷ সে গভীর জলের মাছ। তাকে পাঁকড়াও করা কষ্টসাধ্য হলেও দুঃসাধ্য নয়। সে গভীর জলের মাছ হলে আমিও সামুদ্রিক মাছ শিকারী হিসেবে অবতীর্ন হব। সিদ্দীক কে বললাম রেডি হতে।
আজ রাতে ওর পূর্বের মালিকের পরিত্যক্ত বাসায় অভিযান চালাতে হবে।
সিদ্দীকের বাসাটার আনাচে কানাচে হাতের তালুর মত জানাশোনা। সুতরাং শুধুমাত্র ভেতরে ঢোকাটা কষ্টসাধ্য হবে। বাকিটা খুব সহজ।
ছাদের উপরে গল্পগুজব করতে করতেই সন্ধ্যা নেমে এলো।
আমরা মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছি, ভেতরে একটা অপরাধবোধ তো কাজ করছেই তবে উত্তেজনাও কম কাজ করছে না।
হুট করেই বাবুমিয়ার ফোন কল আসলো। তিনি আমাকে দেখা করতে বললেন।
সিদ্দীক কে নিয়ে রওনা দিলাম তার শো রুমের ঠিকানায়।
ঠিক করলাম, যদি রাজি থাকেন তিবে আমাদের এডভেঞ্চারে আমার সাথে বাবু মিয়াকেও নিয়ে যাবো।
সব হিসেবের মাঝেও একটা হিসেব আমি কিছুতেই মিলাতে পারলাম না। ইলিয়ানা কিভাবে ওদের সাথে যুক্ত হলো। আমার মনে হচ্ছে সিদ্দীকের মালিকের বাসা থেকে বন্ডেজ ক্লাবে ঢোকার এক্সেস কার্ড উদ্ধার করার পর শীঘ্রই উত্তরা সাত নং সেক্টরের বাড়িটায় আমাকে আবার যেতে হবে। আগের বার শিকার হয়ে পালিয়ে বাঁচতে হয়েছিলো। এবার শিকারী হয়ে হামলা দিতে যেতে হবে। কে জানে! ওদের আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজের ভেতর আমার মত কতজনকে ওরা বন্দী করে রেখেছে!
-
-পর্ব_১৬
মাষ্টার প্লান টা আমি করলাম।
সিদ্দীক আমাকে ওর মালিকের বাসার টেরিটোরি সম্পর্কে সব কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে বলে দিলো।
বাবুমিয়ার সাথে দেখা করার পরে,
উনি সবকিছু শুনে উত্তেজনায় কাঁপতে লাগনে। এমন একটা পরিত্যক্ত বাড়ি থেকে এক্সেস কার্ড চুরি করার ব্যপারটা ওনার জন্য খুব উপভোগ্য এবং এডভেঞ্চারের।
আমি ওনার বেশি উৎসাহ দেখে বলে ফেললাম,
ভাইজান এটা কোন বাচ্চাদের গেইম না।
আমরা যেটা করতে যাচ্ছি সেটা আইনের চোখে অপরাধের একটি কাজ। কোন ভাবে পুলিশের কাছে ধরা পড়ে গেলে, হয়ত ঐ বাড়ির মালকিনের মার্ডারের কেস এ আমাদের ই ফাঁসিয়ে দেয়া হবে।
বাবুমিয়া বললো!
"আরে তোমার কোন আয়ডিয়া ই নেই আমার সম্পর্কে, আমি বেশ কয়েকবছর ডিফেন্সে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। দেয়াল টপকানো, জোড়ে দৌড়ানো এবং লোকের চোখ ফাঁকি দিয়ে কোথাও যাওয়াতে আমি খুব এক্সপার্ট। "
সিদ্দীক হঠাৎ করেই কান্না শুরু করলো।
অদ্ভুত ব্যপার হলো, সিদ্দীকের কান্না হুবুহু মেয়েদের মত। ছেলেরা কান্না করলে মেয়েদের মত শুনায়, এই প্রথম অবলোকন করলাম।
জিজ্ঞেস করলাম, " কি ব্যাপার সিদ্দীক তুমি মেয়েদের মত কাঁদছ কেনো? "
- বস, ঐ বাড়িতে আবার, কোনদিন ঢুকতে পারবো, তা ভাবিনি। আমার চতুর্থ ট্রু-লাভ ছলনার একটা ছবি ঐ বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছি।
আমি যখন গ্রাম থেকে শহরে দাঁড়োয়ান এর চাকরী নিয়ে চলে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন ছলনা আমার জন্য অনেক কান্নাকাটি শুরু করে। আমি ওকে অনেক বুঝাই। কিন্তু ও বুঝেনা,বিরহের আগুনে ওর কলিজা ছানখান হয়ে যায় বস।
"থামো,
ওর কলিজা যে ছানখান হয়ে গেছে তা তুমি দেখেছো? "
"না দেখলেও বুঝেছি।ছানখান হওয়ার বেদনা সইতে না পেরে ছলনা আমার জন্য বিষ খেয়ে মারা যায়।
ওর শেষ স্মৃতি হিসেবে একটামাত্র ছবি ছিল আমার কাছে। ওটা আমি ঐ বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছি। আজ নিয়ে আসবো বস, তাই আনন্দে ও বেদনায় কান্না করছি। আপনি কি বুঝবেন একজন বিধব প্রেমিকার কষ্ট!
- বিধব কি?
- মেয়েদের স্বামী মারা গেলে বিধবা বলে। আর ছেলেদের বলে বিধব।
- এটা তুমি কোথায় লেখা পেয়েছ?
- আমি নিজে বানিয়ে নিয়েছি বস।
কান্নার আওয়াজ শুনে আমি ও সিদ্দীক দুজনেই বাবুমিয়ার দিকে তাকালাম।
সে চোখের পানি মুছতে মুছতে, ঠোঁটকে গোল এবং উঁচু করে বলছে,
" ওহ, প্রকৃত ভালোবাসায় শুধু না পাওয়ার যন্ত্রনারে সিদ্দীক, আহ!"
ওদের এমন অবস্থা দেখে আমি হাসব নাকি কাঁদব বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আমি নিশ্চিত আমি এখন এখানে না থাকলে বাবুমিয়া আর সিদ্দীক দুজনে দুজনার গলা জড়িয়ে ধরে কান্নার আসর বসাতো।
আমি বাবুমিয়া এবং সিদ্দীক মিলে একটা ছোট খাটো প্লান বানালাম।
ঐ এলাকায় গিয়ে বাড়িটার ভেতরে ঢুকতে হলে আমাদের তিনটে সিসি ক্যামেরা এবং একজন নাইট গার্ডের চোখ ফাঁকি দিতে হবে৷ নাইট গার্ড হিসেবে একজন মানুষ যখন কর্মরত থাকে তখন তার চোখ ফাঁকি দেয়াটা অনেকটাই সহজ। কিন্তু মানুষের সাথে সাথে যখন একটা ট্রেইন্ড জার্মান শেপার্ডও টহল দেয়, সেক্ষেত্রে কাজটা অনেকটাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবে সিদ্দীক যেহেতু দাঁড়োয়ান ছিলো এবং ও ওখানে টহল দেয়া জার্মান শেপার্ডকে মাঝে মাঝেই খাবার দিতো,
সেহেতু আমাদের কুকুরটিকে নিয়ে তেমন চিন্তার কোন কারণ৷ নেই। এবার আসা যাক সিসি ক্যামেরার চোখ কিভাবে ফাঁকি দিবো সে বিষয়ে৷
যেহেতু সিসি ক্যামেরা চালু থাকা অবস্থায় আমরা কিছুই করতে পারবো না, সুতরাং সিসি ক্যাম কে নষ্ট করে দেয়াটাই শ্রেয়। আর এ ক্ষেত্রে আমার ছোট বেলায় ছটকা বা গুলতি দিয়ে পাখি মারার বিদ্যাটা কাজে লাগবে।
কয়েকটা মার্বেল পাথর আর গুলতি হলেই সিসি ক্যাম গুলোকে একের পর এক নষ্ট করে দেয়া যাবে৷ কিন্তু একটা ঘোরতর সমস্যা আছে।
যিনি সিসি ক্যামেরা গুলোর মনিটরে চোখ রাখার দায়িত্বে আছেন, তিনি পরপর তিনটে সিসি ক্যামেরার সিগন্যাল ক্যাচ করতে না পারলে হয়ত জরুরি ফোর্স পাঠাতে পারেন। তবে হিসেব করে দেখলাম, রাতের বেলা দ্রুত কোন ফোর্স এসে ইনভেস্টিগেশন শুরু করতে করতে প্রায় এক ঘন্টা লেগে যাবে। এবং আমাদের কাজ সে সময়টুকুর ভেতরে হয়েও যাবে।
সবকিছু ঠিক করে আমরা রাত ১২ টার সময়ে শো রুম থেকে পায়ে হেঁটে যাত্রা শুরু করলাম।
রুম থেকে বের হওয়ার পর ই দেখকাম বাবুমিয়ার কপালে অসংখ্য ঘামের বিন্দু জমা হচ্ছে।
তিনি নিজেও বিষয়টি খেয়াল করে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
আসলে এসির ভেতর থেকে থেকে অভ্যাস তো! তাই এমনটা হয়েছে।
বাবু মিয়া কিছুদুর হেঁটে যাওয়ার পর পরই প্রচুর ঘেমে গেলেন। তিনি তার মাথা থেকে নকল চুল টেনে খুলে ফেললেন,আমাদের সামনে উন্মুক্ত হয়ে গেল তার বিশাল এক টাক।
হাতের পর চুল দিয়ে মুখের সামনে বাতাস করতে করতে এগিয়ে চললেন তিনি। সিদ্দীক বাবুমিয়াকে জিজ্ঞেস করলো, মিয়াভাই, আপনার হাঁটতে বুঝি অনেক কষ্ট হইতাছে?
- কি যে বলোনা! সিদ্দীক! আমি একটানা দশ বারো ঘন্টাও হাঁটতে পারি।
সিদ্দীক বড় একটা নিশ্বাস ছেড়ে বললো! "হুম তা আপনাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। "
টুকিটাকি কথা বলতে বলতে আমরা আমাদের প্রাথমিক গন্তব্যে চলে এলাম।
রাস্তার দুই লেনের মধ্যবর্তী এড়িয়ায় থাকা কিছু বড় ফুলগাছের ঝোপঝাড় এর আড়ালে আমরা তিনজন মাথা হালকা নিচু করে বসে আছি।প্রথম সিসি ক্যামেরাটি এখান থেকে এমন এংগেলে বসানো যে আমাদের ক্যাপচার করার কোন উপায় নেই। কিন্তু আমি ঠিক ই এখান থেকে সিসি ক্যামেরাটিতে নিঁখুতভাবে আঘাত হানতে পারবো।
পকেট থেকে মার্বেল পাথর বের করে গুলতির চামড়ার সাথে সেট করলাম,
এরপর প্রচন্ড শক্তি দিয়ে টেনে একচোখ দিয়ে টার্গেট স্থির করে, লখ্যবস্তুর উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিলাম। ঝপ করে রাবার এর একটা শব্দ হলো। মার্বেল পাথর ছুটে গেল লক্ষ্যবস্তুর দিকে। আম গাছে ঢিল মারলে যেমন টুপ করে আম পরে নিচে, সিসি ক্যামেরার মাথাটাও তেমনি টুপ করে ভেংগে নিচে পরে গেলো। তবে সাথে সাথে একটা সমস্যাও সৃষ্টি হলো। তা হলো শব্দ। মার্বেল পাথর গিয়ে যখন সিসি ক্যামেরার উপর আঘাত করে এবং যখন ক্যামেরা নিচে পরে মাটি স্পর্শ করে দু সময়েই খুব জোড়ালো শব্দ হয়।
আশপাশের লোকজনের চোখে পরে গেলে এটা অনেক বড় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
একদিকের একটা সিসি ক্যামেরার দফা রফা করা গেল এবার বাকি দু'দিকের পালা।
পরের বার ও নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে সিসি ক্যাম এ নির্ভুল আঘাত করি। তবে এবার একবারের বেশি শব্দ হয়নি৷ ক্যামেরা ভেংগে নিচে পরার আগেই৷ সিদ্দীক দৌড়ে কাছাকাছি গিয়ে তার হাতের চাদর টা নিচে ছুড়ে মারে। যার ফলে নিচে পরার পরে আগের মত জোরে শব্দ হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়৷
এর ঠিক আধাঘন্টা পরেই তৃতীয় ক্যামেরটাও সফলভাবে ভেংগে ফেলতে সক্ষম হই।
তবে ভাগ্য সুপ্রশন্ন হওয়ায় আমাদের নাইট গার্ড ও জার্মান শেপার্ড এর মুখোমুখি হতে হয়নি।
বাড়ির কাছাকাছি আসার পর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় কাটাতারে মোড়ানো দেয়াল টপকানোটা।
কিন্তু সিদ্দীকের জানা শোনার বদৌলতে,
আমাদের তেমন বেশি বেগ পেতে হয়নি।
বাড়ির একদম পেছনের দরজার ফাঁকা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে খুলে ফেলার ট্রিকস জানা ছিলো সিদ্দীকের। ও সেভাবেই দরজা খুলে আমাদের নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে দরজা পুনরায় বন্ধ করে দেয়।
পুরো বাড়িটি থমথমে অন্ধকার। শুধুমাত্র বাড়ির আঙিনায় ঢুকলাম আমরা। এরপরের চ্যালেঞ্জ বাড়িটার ভেতরে ঢোকা। পুরো বাড়িতে মোট দুটি দরজা। দুটোতেই বড় বড় তালা ঝোলানো। সিদ্দীকের ভাষ্য অনুযায়ী এখন বাড়িতে একমাত্র উপায় হচ্ছে, বাড়িটির পাশে থাকা মোটা পাইপ বেয়ে উপরে উঠে দ্বিতীয় তলায় থাকা জানালার থাই গ্লাস ভেংগে ফেলা। গ্লাস ভাংগা গেলেই ভেতরে ঢোকা যাবে। কারণ দোতলার গ্লাসে ভেতর থেকে গ্রিল লাগানো নেই।
নিঃশব্দে জানালার কাচ ভাংগাটা কঠিন। তবে ট্রিকস জানা থাকলে,
সেটা অবশ্যই কঠিন নয়।
প্রথম পাইপ বেয়ে আমিই উপরে উঠে যাই। উপরে উঠে সানসেটে দাঁড়িয়ে জানালার কাছাকাছি চলে যাই। এরপর আমার পেছন পেছন উঠে সিদ্দীক।
কিন্তু সমস্যা হয় বাবুমিয়াকে নিয়ে। সে কোনো ভাবেই তার মোটা ভুড়িটি নিয়ে পাইপ বেয়ে উপরে উঠতে পারছিলো না।
কিন্তু সে নিচেও একা থাকবে না। তার নাকি ভয় করে। আমরা যখন উপরে উঠে জানালা ভাংগার বন্দোবস্ত করছি, সে তখন নিচে বসে চিৎকার চেচামেচি শুরু করেছে। তাকে থামাতে বাধ্য হয়ে আমাদের দুজনের নিচে নেমে আসতে হলো। এই লোককে নিয়ে বেশ মুসিবতে পরা গেলো।
তাকে কিভাবে উপরে উঠানো যাবে, তা নিয়ে বেশ কিছুক্ষন ভাবার পরে, সিদ্দীক কোথা থেকে যেন একটা দড়ি জোগাড় করে নিয়ে আসে। এরপর আমরা ওনার কোমড়ে দড়ি বেঁধে উপরে তোলার ব্যবস্থা করি। যখন টেনে তুলছিলাম তখন বাবুমিয়ার মুখ থেক্ব বের হওয়া উহ আহ ওমাগো শব্দগুলো আমাদের হাসির কারণ হচ্ছিলো। সিদ্দীক তো হাসতে হাসতে দঁড়ি ছেড়ে দেয়ার অবস্থা। অনেক কষ্টে দুজনের প্রচেষ্টায় একটা দেড়শ কেজির মূর্তিকে উপরে তুললাম।
উপরে তুলে বাঁধলো আরেক বিপত্তি, দড়ি তার মাংসের ভেতর কেটে পরে নাকি সে প্রচুর ব্যথা পেয়েছে। এখন যেভাবেই হোক তার ব্যাথা কমাতে হবে। অনবরত ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছে বাবুমিয়া। সিদ্দীক উপয়ান্ত না দেখে মোবাইলের টর্চ তার কোমড়ে ধরলো।
আমিও দেখতে পেলাম আসলেই দড়ি তার থলথলে মাংসের ভেতরে বিঁধে কালো দাগ হয়ে গেছে। সিদ্দীক হাত দিয়ে তার আঘাতের উপর একটু আদুরে মালিশ দিয়ে বললো, কষ্ট পেতে হবে না। এক্ষুনি চলে যাবে বাবু, মিয়া।
সিদ্দীকের শান্তনা কাজে দিলো। তার কান্না থামলো।
ওরা যখন এসব কাজে ব্যস্ত আমি তখন জানালার থাই গ্লাস পুরোটুকুই সাথে করে নিয়ে আসা স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে ফেলেছি। পকেট থেকে ছোট হাতুড়ি বের করে সেটার মাথায় আমার পরিধেয় গেঞ্জি পেঁচিয়ে সজোরে কয়েকবার আঘাত করতেই হালকা একটা শব্দ শুনতে পাই। বুঝলাম কাঁচে ফাঁটল ধরেছে।
হাতুড়ির মাথায় গেঞ্জি লাগানো থাকায়, জোরে আঘাত করায়, কাচের উপরে বেশ প্রেসার লাগলেও শব্দ হয়নি এবং বাইরে স্কচটেপের আস্তরণ থাকায় কাঁচ ভেংগে গেলেও, ঝনঝন শব্দ করে নিচে পরেনি।
আস্তে আস্তে পুরো কাচটুকুই হাতুড়ির আঘাতে ভেংগে সরিয়ে ফেলতে সক্ষম হই। কিন্তু কাঁচ ভেংগে জানালা ফাঁকা করতেই প্রচন্ড পঁচা গন্ধ এসে নাকে লাগে আমাদের। বাবুমিয়া শব্দ করে ওয়াক করে উঠে। সিদ্দীক এক হাতে নিজের নাক আরেক হাতে বাবুমিয়ার মুখ চেপে ধরে। টর্চের আলো জানালা দিয়ে ভেতরে ফেলতেই দেখতে পাই এক বিভৎস দৃশ্য।
খাটের উপরে পরে আছে দুটি পচা গলা লাশ।
পোকা গিজিগিজ করছে লাশের ভেতরে।
একটি লাশ বিছানার ঠিক মাঝ বরাবর। আরেকটি বিছানার একদম কিনারে।
কিনারের লাশটি থেকে একটি পা পচে গিয়ে ফ্লোরের উপরে খুলে পরে আছে। দৃশ্যটি দেখেই আমার মাথা ঘুরে উঠে। মনে হচ্ছিলো সানসেট থেকে পা ফসকে এখনি নিচে পরে যাব।
- চলবে...
.png)
