বন্ধু

@Admin
0







 'আমি তো মাছ গোশত ছাড়া ভাতই খেতে পারি না। শাক সবজি দিয়ে ভাত খাওয়া যায় নাকি!' নাক চোখ কুঁচকে কথাটা বললো জিনিয়া।

টিফিন টাইম চলছে। টিফিন বক্স থেকে সাদা ভাত আর কুমড়ো ভাজির তরকারি বের করে খেতে বসেছে আলিয়া।
জিনিয়া পিজ্জার টুকরায় কামড় দিয়ে চিবাতে চিবাতে আলিয়াকে প্রশ্ন করলো, 'রোজ রোজ সবজি খেতে খারাপ লাগে না তোমার?'
তাকে অপমান করার জন্যই প্রশ্নটা করেছে জিনিয়া, আলিয়া টের পায় সে কথা৷ অপমান গায়ে না মেখে আলিয়া হেসে উড়িয়ে দিয়ে জবাবে বললো, 'বরং সবজি না হলেই খারাপ লাগে।'
আলিয়ার হাসিমুখ দেখে জিনিয়া ভেংচি কেটে পাশে থাকা বান্ধবীদের সঙ্গে চাপা স্বরে গজগজ করে বলে উঠলো, 'মেয়েটার সবকিছু নিয়ে অহংকার। কোনোকিছুতেই তার অপমানবোধ হয় না। ওর মা তো লোকের বাসায় কাজ করে, বাবাও নাই। এত অহংকার আসে কোথা থেকে ওর?'
পাশ থেকে বান্ধবীরা জিনিয়ার কথায় সায় দিয়ে বললো, 'একদম ঠিক বলেছিস।'
আলিয়া ক্লাসে ফার্স্ট গার্ল। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে, তারউপর যথেষ্ট মেধাবী, স্কুলের শিক্ষকদের কাছেও খুব প্রিয় ছাত্রী সে। এসব কারণেই আলিয়াকে প্রচন্ড হিংসা করে জিনিয়া। সুযোগ পেলেই তাকে ছোট করে কথা শোনাতে ভুল হয় না জিনিয়ার।
গতকাল জিনিয়ার জন্মদিন ছিলো। সেই উপলক্ষে আজ ক্লাসের বন্ধুদের জন্য কেক নিয়ে এসেছে সে। সবাইকে কেক দিলেও আলিয়াকে দিলো না।
'কেকের মধ্যে তো সবজি দেওয়া নেই৷ তুমি তো আবার সবজি ছাড়া খেতে পারো না। তাই তোমাকে দিলাম না। কিছু মনে করো না আলিয়া।'
জিনিয়ার কথায় আশেপাশের সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। জিনিয়ার এসব আচারণ আলিয়াকে পীড়া দিলেও হজম করে নেয় সে৷
হাসিমুখে উত্তর দেয় বুদ্ধিমতী আলিয়া, 'খুব ভালো করেছো তুমি। কেক আমার তেমন পছন্দ না। জন্মদিনের শুভেচ্ছা রইলো। গতকাল স্কুল বন্ধ ছিলো, তাই শুভেচ্ছা জানাতে পারিনি বলে তুমিও কিছু মনে করো না জিনিয়া।'
আলিয়া কেক খেতে খুব ভালোবাসে। তার মা যেসব বাসায় কাজ করেন, ওসব বাসায় বার্ষিকী জাতীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে সেখান থেকে পাওয়া কেকের টুকরোগুলো আলিয়ার জন্য তিনি যত্ন করে নিয়ে আসেন৷ আলিয়া তখন তার মায়ের সঙ্গে মজা করে কেক খায়। আজ জিনিয়ার আনা কেক দেখে আলিয়ার খাওয়ার ইচ্ছে হলেও সেই ইচ্ছে ভেতরেই চেপে রাখলো সে।
আলিয়াকে বারবার অপমান করতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়ায় আরও রেগে যায় জিনিয়া। আলিয়া কেন তার কথায় কষ্ট পেয়ে মন খারাপ করে না, এটাতেই তার যত ক্ষোভ। অতি আদর আহ্লাদে বড় হওয়া জিনিয়া অন্যকে ছোট করতে পারলেই যেন আনন্দ পায়। সঙ্গের বন্ধুরাও তার এমন আচারণকে প্রতিনিয়ত উসকে দেয়।
বছর খানেক পরেই মাধ্যমিক শেষ হবে আলিয়া জিনিয়ার। ক্লাসে ভীষণ অমনোযোগী জিনিয়াকে নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই শিক্ষকদের। বাসায় টিউটর থাকলেও পড়াশোনা নিয়ে ততটা মাথা ব্যথা নেই তার। মেয়ে কষ্ট পাবে ভেবে বাবা মা'ও কখনো কড়া স্বরে শাসন করেন না। মেয়েও তাই বাবা মায়ের নরম গলার শাসনকে কখনো পাত্তাই দেয় না।
প্রি-টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট আউট হলে শিক্ষকগণ স্পষ্ট স্বরে জানিয়ে দিলেন টেস্ট পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো না হলে তারা জিনিয়ার জন্য কিছুই করতে পারবেন না। এবার আর জিনিয়ার মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া হবে না তবে।
এর আগে এমন কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন জিনিয়া হয়নি। এতদিন শ্রেণী পরীক্ষার রেজাল্ট কার্ডে বাবা মাকে পটিয়ে স্বাক্ষর করাতে তার খুব একটা বেগ পোহাতে হয়নি। কিন্তু এবার সে কী করবে, ভেবে পায় না।
সঙ্গের বন্ধুরাও জিনিয়ার থেকে আজকাল খুব দূরত্ব বজায় রেখে চলছে। এতদিন পাশে থাকা সেই বন্ধুরাই এখন আড়ালে আবডালে তাকে ফেলুয়া বলে টিটকারি মারে। বিষন্নতা আর হতাশায় ছেয়ে যায় জিনিয়ার মন। এমন পরিস্থিতিতে সাহায্যের হাত বাড়ায় আলিয়া।
'এখনো তো অনেকদিন বাকি আছে জিনিয়া। আমরা ততদিন স্কুলে তাড়াতাড়ি এসে একসঙ্গে পড়াশোনা করতে পারি। অফ পিরিয়ডগুলোকেও কাজে লাগাতে পারি৷ একে অপরকে সহযোগিতা করলে আমরা অবশ্যই আরও বেশি ভালো করব, দেখবে।'
আলিয়ার এমন কোমল স্বরের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায় জিনিয়া। এতদিন বন্ধুদের সঙ্গে গল্প গুজব আর তামাশা করে পার করা সময়গুলো সে এখন আলিয়ার সঙ্গে পড়াশোনা করে কাটায়৷ স্কুল এবং বাড়ি দু'জায়গাতেই দিন দিন মনোযোগী হয়ে ওঠে জিনিয়া। তার এমন পরিবর্তনে খুশি শিক্ষক ও পরিবার। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে খুশি টিউটরও।
টেস্ট পরীক্ষার খুব বেশিদিন বাকি নেই আর৷ আগের মতো ওতটা ভয় এখন আর জিনিয়া পায় না। কেননা তাকে সাহস দেওয়ার জন্য এখন আলিয়াও আছে। আজ আলিয়ার জন্মদিন৷ টিফিন টাইমে টিফিনবক্স থেকে সবজি আর সাদা ভাত বের করে খেতে বসেছে সে।
জিনিয়া পাশে এসে বললো, 'আমি কী আজ তোমার সঙ্গে সবজি দিয়ে ভাত খেতে পারি আলিয়া?'
আলিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো জিনিয়ার মুখের দিকে। তারপর হেসে বললো, 'অবশ্যই।'
খাওয়া শেষ হলে জিনিয়া দৌড়ে গিয়ে ব্যাগ থেকে একটা বড় আকারের বক্স নিয়ে এসে আলিয়াকে দিয়ে বললো, 'তোমার টিফিন তো অর্ধেকটা আমিই খেয়ে ফেলেছি৷ তাই এটা তোমার জন্য।'
আলিয়া অবাক স্বরে প্রশ্ন করে, 'কী আছে এর ভেতরে?'
'খুলেই দেখো।'
আলিয়া বক্সটা খুলতেই দেখে একটা চকলেট কেক। তার উপর রাখা আছে ছোট্ট একটা চিরকুট। তাতে লেখা, 'শুভ জন্মদিন আলিয়া। আমরা কী বন্ধু হতে পারি?'
আলিয়া খুশিতে গদগদ হয়ে জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো, 'অনেক ধন্যবাদ তোমায়। অবশ্যই আমরা বন্ধু হতে পারি। কিন্তু তুমি জানলে কী করে আজ আমার জন্মদিন?'
'সেদিন স্যারের টেবিলে তোমার জন্ম নিবন্ধনের কাগজটা দেখেছিলাম।'
জিনিয়া খুশি হয়ে আবার বললো, 'তাহলে আজ থেকে আমরা বন্ধু তো?'
আলিয়া হেসে বলে, 'একদমই তাই।'
জিনিয়া তাড়া দিয়ে বললো, 'এবার তাড়াতাড়ি কেকটা কাটো। টিফিন টাইম শেষ হয়ে যাবে তো।'
জিনিয়া কাটা কেকের একটা টুকরো তুলে আলিয়ার মুখে দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, 'কেমন হয়েছে খেয়ে বলো।'
খাওয়া শেষ করে আলিয়া হেসে বললো, 'খুব সুন্দর হয়েছে।'
'আমার আম্মু তৈরি করেছে। বলেছি আমার প্রিয় বন্ধুর জন্মদিন।'
'খুব খুশি হয়েছি আমি। এর আগে কখনো আমার জন্মদিনে কেউ কেক এনে দেয়নি। সংসারে অভাব থাকলে বার্ষিকী উদযাপন হয় নাকি!'
আলিয়ার কথাগুলো বিষন্নতা জাগায় জিনিয়ার ভেতরে। নিজেকে সামলে নিয়ে হেসে বললো, 'তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি কেক খেতে ভীষণ পছন্দ করো। তবে কী সেদিন মিথ্যে বলেছিলে?'
আলিয়া মাথা নেড়ে বললো, 'হুম।'
'খুব পাঁজি মেয়ে তুমি। এবার তাড়াতাড়ি এই টুকরোটা শেষ করো। বাকিটা বাসায় গিয়ে মায়ের সঙ্গে সাবাড় করো।'
হাতে থাকা কেকের টুকরো খাওয়া শেষ করে আলিয়া বললো, 'কেকটা দারুণ হয়েছে খেতে।'
'ভেতরে সবজি দেওয়া আছে যে।'
জিনিয়ার কথা শুনে অবাক হয় আলিয়া। 'সত্যি?'
হেসে উঠলো জিনিয়া৷
'মজা করেছি আমি।'
'তুমিও কিন্তু কম পাঁজি মেয়ে নও।' আলিয়ার কথায় আবার হেসে ওঠে জিনিয়া৷
জীবনের চলার পথটা আরেকটু মসৃণ করার জন্য বন্ধুর প্রয়োজন। ভালো বন্ধু পেতে হলে প্রথমে নিজের ভালো মানসিকতা গড়া প্রয়োজন। আর ভালো বন্ধু হতে গেলে বন্ধুর বিপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন৷ জীবনে একজন ভালো বন্ধু থাকা ভীষণ প্রয়োজন।
গল্প: বন্ধু।
লেখা: মাহফুজা রহমান অমি।

Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)