পাসওয়ার্ড ১ম পর্ব

@Admin
0

 



আমার স্বামী আমাকে সত্যিই ভালোবাসে কি-না জানতে খুব ইচ্ছে করে। তাই ফেজবুকে একটা ফেইক আইডি ওপেন করে, আমার স্বামীকে রিকোয়েস্ট পাঠালাম। খুব ইচ্ছে তার ভালোবাসা পরীক্ষা নিবো। আগে অবশ্য এইসব ইচ্ছে মাথায় আসেনি। কিন্তু তানিয়া কাছ থেকে যখন জানতে পারলাম ও-র কাছে ও-র বরের ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড আছে। সে তানিয়ার থেকে কিছুই লুকিয়ে রাখে না তখন তানিয়ার সুখ দেখে খুশি হলেও, নিজের জন্য অনেক খারাপ লাগছিল। নাজিমের মোবাইলটাও আমি কখনো ছুঁয়ে দেখতে পারি না। ফেসবুক আইডি তো অনেক দূরের ব্যাপার। খুব ইচ্ছে হলো ভালোবাসার পরীক্ষা নেওয়ার। নাজিমকে পরীক্ষা করবো বলে একটা ফেইক আইডি খুললাম। তারপর নাজিমকে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে ফোনটা রেখে দিলাম। আমি এই পরীক্ষায় হারবো না জিতবো কিছুই বলতে পারছি না। মনের ভিতর নানান প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে। আমি খুব করে চাই যেন আমি এই পরীক্ষায় হেরে যায়। নাজিমকে আমি অনেক ভালোবাসি। কিন্তু আমি সত্যিটা জানতে চাই। কয়েকদিন আগে আমি আমার কলেজ জীবনের বান্ধবী তানিয়ার সাথে দেখা করতে গেছিলাম। সেদিন,
--" দোস্ত জানিস আমার বর আমাকে খুব ভালোবাসে। ও-র দুইটা ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ডই আমার কাছে আছে। আমাদের ভিতর কোনো লুকোচুরি নেই। ও নিজে থেকেই আমার ফোনে লগইন করে দিয়েছে। স্বামী স্ত্রী ভিতর লুকোচুরি রাখতে নেই।
তানিয়ার কথায় আমার মনটা খারাপ হয়ে গেলো। নাজিমের সাথে আমার বিয়ে হয়েছে প্রায় দুইবছর। এর ভিতর কখনোই নাজিম ওর ফোনের লক পর্যন্ত আমাকে জানতে দেয়নি। আমি অবশ্য কখনো নাজিমের কাছে এসব ব্যাপারে জানতে চাইনি। প্রয়োজন হলে ও-র ফোন থেকে কথা বলতাম শুধু। কথা বলা শেষ হলে নাজিম নিজের মোবাইল নিয়ে যেতো। নাজিমকে আমি সন্দেহ করি এমনটা না তবুও কেন যেন মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
আমাকে চুপ থাকতে দেখে তানিয়া আবারও বলে উঠলো, " কি হলো তোর? মুখ কালো করে বসে আছিস কেন? "
তানিয়ার কথায় আমি হাসতে চেষ্টা করলাম, ঠোঁটের কোণে মিথ্যা হাসি ঝুলিয়ে বললাম, " কিছু না রে। এমনই ভালো লাগছে না কিছু।"
--" আচ্ছা মিতা তুই বিবাহিত জীবনে সুখী তো?
--" হ্যা রে আমি অনেক সুখী। নাজিম খুব ভালো। আমার অনেক খেয়াল রাখে।"
--" ফাহাদও আমার অনেক খেয়াল রাখে। আচ্ছা নাজিমের ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড জানিস তুই?"
তানিয়ার এমন প্রশ্ন শুনে আমি কিছুটা বিব্রতবোধ করতে লাগলাম। সত্যি বলতে নাজিমের ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড আমি জানি না। এমনকি আমি কখনো নাজিমের ফোনটাও হাতে ধরি না৷ বিয়ের কয়েকদিন পর নাজিম আমাকে একটা মোবাইল কিনে দিয়েছিলো। সেই থেকে আমি আমার ফোনই ব্যবহার করি। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে তানিয়া বলে উঠলো, " বুঝতে পেরেছি, তোর বরের ফেসবুক আইডির পাসওয়ার্ড তুই জানিস না। আজকালকার ছেলে ফেসবুকে হয়তো নানান মেয়ের সাথে কথা বলে সেগুলো তোর থেকে লুকিয়ে রাখতেই তোকে পাসওয়ার্ড দেয় না। "
তানিয়ার এই সামান্য কথাগুলোই আমার মনকে বিষিয়ে দিতে সক্ষম হলো। মনের ভিতর হাজারও সন্দেহ জেগে উঠলো। কেন নাজিম আমাকে ও-র মোবাইল ধরতে দেয় না। তানিয়ার বর তো তানিয়ার থেকে কিছু লুকিয়ে রাখে না। তাহলে কি নাজিমের অন্য কোনো মেয়ের সাথে সম্পর্ক আছে? না এসব আমি কি ভাবছি! আমি নাজিমকে পাগলের মতো ভালোবাসি, নাজিমও আমাকে অনেক ভালবাসে, আমার অনেক খেয়াল রাখে, আমাদের সম্পর্কের মাঝে তৃতীয় কেউ থাকতে পারে না।
আমি চুপচাপ বসে আছি দেখে তানিয়া বললো, " একটা কাজ করতে পারিস মিতা। একটা ফেইক আইডি খুলে তোর বরকে পরীক্ষা করে দেখতে পারিস। সরাসরি পাসওয়ার্ড চাইলে হয়তো সর্তক হয়ে যেতে পারে। "
তানিয়ার বুদ্ধিটা আমার বেশ পছন্দ হলো। নাজিম কখনো আমার মোবাইল চেক করে না। ফেইক আইডি চালালেও বুঝতে পারবে না।
--" আচ্ছা তানিয়া তুইও তোর বরকে পরীক্ষা করে দেখতে পারিস। যদিও তোর বরের আইডি তোর কাছে আছে তবুও একবার না হয় হেরে গিয়ে সুখ পেলি।"
তানিয়া আমার কথায় হো হো করে হেসে উঠলো। তারপর চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো, " কি যে বলিস না মিতা! ফাহাদের আইডি তো আমার কাছে। '
আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই ফাহাদ চিৎকার করতে করতে ঘরে ঢুকলো। ঘরে আসার পর তানিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো, " তুমি কবে ঠিক হবে বলো তো? আজ একটা মেয়েকে আমি ফেসবুকে এড করেছিলাম তুমি তাকে ব্লক দিয়েছো কেন? "
তানিয়া স্বাভাবিক ভাবে বললো, " আমি চাই না তুমি কোনো মেয়ের সাথে কথা বলো। ঘরে বউ থাকতে অন্য মেয়ে কেন তোমার ফেসবুক ফ্রেন্ড থাকবে?"
--" তানিয়া নিজের মনটাকে একটু বড় করো। ওই মেয়েটা আমাদের নতুন এমডি। উনার থেকে আমার কিছু কাজ বুঝে নেওয়ার ছিলো তাই ফেসবুকে এড হয়েছি এতে দোষের কি আছে?"
তানিয়া আর কিছু না বলে আমার দিকে ইশারা করলো। ফাহাদও আমাকে দেখে শান্ত গলায় বললো, " আরে মিতা তুমি! তোমার পাগলী বান্ধবীকে দেখো কোনো মেয়ের সাথেই আমাকে দেখতে পারে না। শুধু সন্দেহ করে। তা তুমি কখন এলে?"
আমি মুচকি হেসে জবাবে বললাম, " এইতো বেশ কিছুসময় হয়েছে। তোমাদের ভিতর অনেক ভালোবাসা। সারাজীবন একসাথে থেকো তোমরা। "
ফাহাদ আমার কথায় কোনো জবাব দিলো না। শুধু মুচকি হাসলো। সেদিনের মতো ঘোরাঘুরি করে বাড়িতে চলে আসলাম। কিন্তু নাজিমকে পরীক্ষা করার ব্যাপারটা আমার মাথায় থেকে গেলো। সেদিন রাতে খাওয়ার পর নাজিমকে বললাম, " আচ্ছা নাজিম তোমার ফেসবুক আইডিটা আমাকে দেবে? "
নাজিম বিরক্ত চোখে আমার দিকে তাকালো। তারপর একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললো, " কেন আমার আইডি তোমার দরকার কি জন্য? তোমার তো আইডি আছে। তুমি নিজের আইডি চালাও"
নাজিমর কথায় আমার ঠিক কতোটা কষ্ট হয়েছিলো বলে বোঝাতে পারবো না। মনে হচ্ছিল কেউ আমার বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে রেখেছে। কথা বলতেও পারছিলাম না। বারবার গলা ধরে আসছিলো। সেদিন কোনো রকম নাজিমের চোখ ফাঁকি দিয়ে রান্নাঘরে চলে গেছিলাম। যার কাছে আমার থেকে তার ফেসবুক আইডি বড় তাকে নিজের কষ্ট দেখানোর কোনো মানে হয় না। রান্নাঘরের দরজা আটকে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিলো কিন্তু কেন জানি কাঁদতে পারছিলাম না। হয়তো অধিক শোকে পাথার হয়ে গিয়েছিলাম। কোনো কথা বলতে পারছিলাম না।
এরপর থেকে নাজিমের কাছাকাছি খুব একটা যেতাম না আমি। কথা বলাও কমিয়ে দিয়েছিলাম। একদিন নাজিম আমাকে ডেকে প্রশ্ন করলো, " মিতা কি হয়েছে তোমার? কয়েকদিন ধরে দেখছি কেমন চুপচাপ হয়ে গিয়েছো। কোনো বিষয় নিয়ে মন খারাপ নাকি কোনো দুশ্চিন্তায় আছো?"
ইচ্ছে করছিলো ও-র চোখের দিকে তাকিয়ে বলি যে, " ফেসবুক আইডি দিলে আপনার সব প্রেমিকার খবর পেয়ে যাবো তাই আমাকে ফেসবুক আইডি দিতে পারলেন না এইতো!"
কিন্তু এখন এমনটা বললে চলবে না। আমি নিজে আগে পরীক্ষা করে নিবো। হাতে প্রমাণ না নিয়ে কোনো কিছু বললে হিতে বিপরীত হতে পারে। আমি মুচকি হেসে বললাম, " আজকাল শরীরটা অনেক খারাপ থাকে তাই কিছু ভালো লাগে না।"
আমার শরীর খারাপের কথা শুনে নাজিম ব্যস্ত হয়ে আমার কপালে গলায় হাত দিতে থাকলো। তারপর বললো, " শরীর তো ঠান্ডা আছে। কোথায় কি খারাপ লাগছে বলো? তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে এসো। আমাকে আগে বলবে না তুমি যে শরীর খারাপ!"
নাজিমের অস্থিরতা দেখে আমার মন একরাশ মুগ্ধতায় ভরে গেলো। আমি হয়তো ভুল ভাবছি। নাজিম অন্যকাউকে ভালোবাসলে আমার এতোটা খেয়াল রাখতো না। মনে মনে ভাবলাম আইডিটা ডিলেট করে দিবো নাজিমকে পরীক্ষা করা হয়তো ঠিক হবে না আমার। সেদিন নাজিম জোর করে আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলো। ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফেরার পথে আমাকে নিয়ে নদীর পাড়ে ঘুরতে গেলো। অনেক সুন্দর সময় কাটালাম নাজিমের সাথে। এতোদিনের বিষন্নতা কেটে উৎফুল্ল হয়ে উঠলাম। সারা বিকাল ঘোরাঘুরি করার পর হোটেলে রাতের খাবার খেয়ে বাড়িতে আসলাম। আজকে আমার মনটা অনেক ভালো আছে। বোরকা হিজাব খুলে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ফ্রেশ হয়ে ঘরে আসার পর নাজিম আামকে বললো, " মিতা তুমি কিছু সময় বিশ্রাম নেও। আমি একটু বাইরে থেকে আসি। "
খুব বলতে ইচ্ছে করলো, " না তুমি কোথাও যেও না। আমার কাছে থাকবে এখন। " কিন্তু কথাগুলো মুখে বলা হলো না। মনের মাঝেই রয়ে গেলো। মন খারাপ করে বললাম, " সাবধানে চলাচল করবেন। "
নাজিম মুচকি হেসে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুক ওপেন করলাম। কিন্তু যা দেখলাম তাতে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। নাজিম আমার ফেক আইডির রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করেছে। সেই সাথে এসএমএস দিয়ে জানতে চেয়েছে আমি কে!
আমার তখন কেমন লাগছিলো বলে বোঝাতে পারবো না। একদিনও হলো না এর আগেই রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করে এসএমএসও দেওয়া হয়েছে। এসএমএস দেওয়ার সময়টা দেখলাম কয়েক মিনিট আগে। তার মানে ঘর থেকে এসব কারণে বেরিয়েছে। চোখের পানিগুলো মুছে রিপ্লে দিলাম, তারপর মোবাইলটা বালিশের নিচে রেখে শুয়ে রইলাম। পরবর্তী রিপ্লে দেখার জন্য!
চলবে...


Post a Comment

0Comments
Post a Comment (0)